ভালোবাসার ক্যানভাস

# কলমে অচেনা দিয়াশা


পৃথিবীটা নাকি ছোট হতে হতে

স্যাটেলাইট আর কেবলের হাতে

ড্রয়িংরুমে রাখা বোকা বাক্সতে বন্দী

আ হা...


ঘরে বসে সারা দুনিয়ার সাথে

যোগাযোগ আজ হাতের মুঠোতে

ঘুচে গেছে বেশ কাল সীমানার গন্ডি

আ হা...


ভেবে দেখেছো কী ?

তারারাও যত আলোকবর্ষ দূরে

তারো দূরে

তুমি আর আমি যাই ক্রমে সরে সরে ।


******************************************

একটি ছেলে হাতে গিটার হাতে সুর তুলেছে খোলা আকাশের নীচে তার দুই চোখ দিয়ে বয়ে চলেছে অশ্রুধারা।

গানের মাধ্যমে ব্যক্ত করতে চাইছে তার সমস্ত ভালোবাসা ,দুঃখ,কষ্ট ,অভিমান ।

হঠাৎ কারুর ডাকে পিছন ঘুরে তাকায়, আর সামনে থাকা মানুষটিকে অর্থাৎ মেয়েটিকে সেই সময়ে দেখে অবাক হয়ে যায়।


মেয়েটি সিক্ত নয়নজোরা নিয়ে কাঁপা কাঁপা স্বরে বলে ওঠে,

------- গানের মাধ্যমে এত কিছু বলতে পারছেন , অথছ একবার সামনে এসে ওই সামান্য কথাটা স্বীকার করা গেলো না । এইভাবে দূরে চলে এলেন I


**********************************************


গল্পের সূত্রপাত:-


একটি মেয়ে ----- মা , আমি বেরোলাম I

( এই যে ইনি হলেন গল্পের নায়িকা আরাত্রিকা সেন ওরফে দৃষ্টি I রসায়ন বিজ্ঞানের প্রথম বর্ষের ছাত্রী I দৃষ্টি নামটির সাথে সে যেনো ওতোপ্রোত ভাবে জড়িত I সে তার সৌন্দর্য এর দ্বারা সত্যিই সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে I আর সব থেকে আকর্ষনীয় হল তার পরিস্ফুটিত পদ্মফুলের ন্যায় চোখ জোড়া I কিন্তু শুধু সৌন্দর্য নয় সে তার গুণের দ্বারাও মানুষকে আকর্ষিত করে I ছোটো থেকে ওর একটাই স্বপ্ন ও এই পৃথিবীর সৌন্দর্যকে নিজের ক্যামেরার লেন্সে বন্দি করা I তাছাড়াও নাচে গানে ও সমান ভাবে পারদর্শী I)


দৃষ্টির মা---- হ্যাঁ মা আয় I

এরপর দৃষ্টি কলেজ চলে গেলো I


কলেজর মাঠে দুজন বসে আছে I একজন দৃষ্টি আর একজন হল ওর প্রাণের বন্ধু দেবস্মিতা ওরফে দেবো I


( দেবো খুব মিষ্টি একটা মেয়ে I ও ইংলিশ অনার্স নিয়ে পড়ছে I দেবো ওর বন্ধু দৃষ্টি কে খুব ভালোবাসে I নিজের থেকেও বেশি I ওরা সেই ছোটবেলা থেকে বেস্টফ্রেন্ড I )


----- কী হলো দৃষ্টি, তুই আবার মুখ গোমড়া করে রেখেছিস কেনো?


---- জানিস তো, মাঝেমাঝে না খুব চিন্তা হয় I আমি ঠিক করলাম তো রে কেমিস্ট্রি সাবজেক্ট টা নিয়ে ?


----- সাবজেক্ট টা একটু কঠিন হলেও আমি জানি তুই ঠিক পারবি I আর তাছাড়া এই রকম বড়ো পদক্ষেপ খুব কম মানুষই নিতে পারে I তুই যখন এটা পেরেছিস তাহলে ওটাও পারবি I


---- পারতে তো হবেই সেটা যেভাবে হোক না কেনো I মা বাবা আমায় সব কিছুতে সাপোর্ট করেছে I আমি ফটোগ্রাফি নিয়ে থাকতে চেয়েছি তাই থাকতে দিয়েছে, আমায় তো শুধু বলেছে আমি যেনো গ্রেজুয়েশন টা সম্পূর্ণ করি, কারণ আমি পড়াশোনায় বরাবর ভালো I আর আমি সেই মানুষগুলোর জন্য যদি এটুকু না করতে পারি তাহলে আমি কিসের সন্তান ?


----- একদম, এটাই তো চাই I


------ কিন্তু ভয় একটাই হয়, যে বিষয় টাকে ভালোবাসি না, সেটাকে নিয়ে এগোতে পারবো তো?


দৃষ্টি মনে মনে বললো।


----- কি রে আবার কী ভাবতে বসলি ?


----- না কিছু না I আমি আসি রে এখন আমার দেরী হচ্ছে ক্লাসের I


---- আচ্ছা আয় I


ক্লাসে আসার পর দৃষ্টি দেখে আসেপাশে প্রচুর কথা হচ্ছে, কিন্তু কী বিষয়ে কথা হচ্ছে সেটা ও জানে না I তাই একজন কে কৌতূহল বসত জিজ্ঞাসা করে, এবং জানতে পারে যে ওদের কেমিস্ট্রি টিচার বদল হচ্ছে I কথাটা শুনে তো দৃষ্টি আবার চিন্তায় পড়ে যায় I ভাবতে লাগে,


---- আগের টিচার তো অনেক ভালো মানুষ ছিলেন, ভালো বোঝাতেন I কিন্তু নতুন যিনি আসছেন তিনি কীরকম হবেন ? যদি ভালো না বোঝায়? ভালো লাগে না আমার একের পর এক চিন্তা , ধুর্ I


ওর ভাবনার মাঝখানেই প্রিন্সিপাল একজনকে নিয়ে প্রবেশ করলেন I দৃষ্টি তাকিয়ে দেখলো প্রিন্সিপাল স্যারের সাথে একজন বছর সাতাশ এর যুবক I




হ্যাঁ ইনি হলেন গল্পের নায়ক I ( বয়স সাতাশ বছর, দেখতে হ্যান্ডসাম দাড়ি টা সুন্দর করে ট্রিম করা আর চুলগুলো সেট করা I যা হাজারো মেয়ের হৃৎস্পন্দনের মাত্রা বাড়াতে যথেষ্ট I

কেমিস্ট্রির অধ্যাপক হলেও, ওর জীবন হল ছবি আঁকা, আর ভালোবাসা হল গান I গান টা ওর একান্ত ব্যক্তিগত কারণ সুখে দুঃখে এই গানই ওকে শান্তি দেয়I


কিন্তু ছবি আঁকা নিয়ে ওর অনেক স্বপ্ন I রং ও তুলি যেনো ওর হয়ে কথা বলে I দেশ বিদেশে সকল জায়গায় ও নিজের ছবির মাধ্যমে পরিচিত হতে শুরু করেছে I)



নমস্কার আমি আবির চ্যাটার্জি I তোমাদের রসায়ন বিজ্ঞানের নতুন শিক্ষক I আজ আমার প্রথম ক্লাস তাই প্রথমে আলাপ করা জরুরী I

এরপর একে একে সবাই নিজের পরিচয় দেয় I


আবির যখন ক্লাস শুরু করতে যাবে তখন ওর হঠাৎ সামনের দিকে চোখ পড়ে I ও দেখে একটা মেয়ে গুটিশুটি মেরে বসে আছে I ও মেয়েটিকে এখন ভালো করে লক্ষ্য করছে, মেয়েটির চোখ দেখে বোঝা যাচ্ছে ও কিছু একটা নিয়ে চিন্তিত এবং ভীত I ওর মনে পড়লো মেয়েটির নাম আরাত্রিকা I


আবির কিছু একটা আন্দাজ করে হঠাৎ বলে ওঠে ,

------ ক্লাস শুরুর আগে তোমরা আমায় একটা কথা বলোতো , তোমাদের মধ্যে কি কেউ আছো যে রসায়ন বিজ্ঞানকে ভয় পাও ? বা কোনো কারণে এই বিষয়কে বেছে নিয়েছ ?


কথাটা বলে একবার দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে কিছু একটা বুঝতে পেরে, নিজেই বলতে শুরু করলো,


------- যদি তুমি এই রসায়ন বিজ্ঞানকে ভালো না বাসতে পারো তাহলে কিন্তু তোমার এই বিষয়কে ভালো লাগবে না I

জানো,

আমি যখন স্কুলে পড়তাম আমার কেমিস্ট্রি একদম ভালো লাগত না I আর তাই খুব বাজে নাম্বার পেতাম এই বিষয়ে I কিন্তু একদিন আমার সব ধারণা পাল্টে গেলো, যেদিন আমি কেমিস্ট্রি কে বোঝার চেষ্টা করলাম I

আসলে এই বিষয়টা না অন্য সব কিছুর থেকে আলাদা, এই বিষয়টা হলো বাস্তব জীবনের আয়না I

যেমন আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই এমন কিছু সম্পর্ক থেকে থাকে যেগুলো অনেক মজবুত, ঠিক তেমনই কোনো অনু থেকে পরমাণুকে আলাদা করাও অনেক কঠিন I



তাই রসায়ন বিজ্ঞান কে শুধুমাত্র পড়াশোনা বা বোঝার চেষ্টা না করে একটু ভালোবেসে দেখো, ওই বিষয় টা তোমাকে তার দ্বিগুণ ভালোবাসা দেবে I


আবির এর কথা শেষ হওয়া মাত্রই বেল পরে যায় I তাই ওকে আজকের ক্লাস এখানেই শেষ করতে হয় I ও একবার দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে হাসি মুখে সব স্টুডেন্ট দের বাই বলে বেরিয়ে যায় I


এদিকে আবির এর কথা শুনে দৃষ্টির মনে একটু আশা জেগে উঠেছে I


----- আচ্ছা এই ভাবেও কি একটা বিষয় কে ভালোবাসা যায়? কিন্তু চেষ্টা করতে ক্ষতি কি?


আর ওদিকে আবির বুঝতে পেরেছিল যে দৃষ্টি ওর কথা গুলোর অর্থ সঠিক ভাবে অনুধাবন করতে পেরেছে I এটা ভেবেই আবির এর মুখে একটা মিষ্টি হাসির রেখা ফুটে ওঠে I



এরপর কিছু দিন নিজের মতো কেটে গেলো I

*******************************

আজ দৃষ্টি ঠিক করেছে যে ও চিত্র মেলায় যাবে I ও যেহেতু ছবি তুলতে ভালোবাসে তাই এসবের দিকে ঝোঁক ওর বরাবরই বেশি I


দৃষ্টি মেলায় এসে অসাধারণ সব চিত্র দেখেছিল তখনই ও কিছু একটা শুনে থমকে দাঁড়িয়ে যায় ই


মাইকে আবির এর নাম ঘোষণা করা হচ্ছিল I

দৃষ্টি নিজের অনুমান সঠিক কিনা সেটা যাচাই করতে ছুটে যায় স্টেজ এর দিকে, আর ওখানে আবির কে দেখেই ও থমকে দাঁড়িয়ে যায় I


এদিকে আবির যে কখন দৃষ্টি কে লক্ষ্য করে ওর সামনে এসে দাঁড়িয়েছে সেদিকে দৃষ্টির খেয়ালই নাই I ও একভাবে স্টেজ এর দিকে তাকিয়ে আছে I


আবির এবার একটা নকল কাশির আওয়াজ করে I আর এই আওয়াজ এর মাধ্যমে দৃষ্টি বাস্তবে ফিরে আসে I


এবার দৃষ্টি কিন্তু কিন্তু করে বলে ওঠে...

---- আব.. স্যার আপনি এখানে?


--- কেনো? আমার কি এখানে আশা বারণ নাকি আরাত্রিকা ?


----- না না স্যার তা কেনো হবে? মানে...


------ আমি বলছি, মানে হল এটাই যে তুমি ভাবছ যে আমার মত একজন কেমিস্ট্রি প্রফেসর কী করে একটা চিত্র শিল্পী হতে পারে তাইতো?


---- হ্যাঁ, আর শুধু চিত্র শিল্পী নন আপনি একজন অসাধারণ চিত্র শিল্পী I


--- অসংখ্য ধন্যবাদ I আসলে কি জানতো এই ছবি আঁকা টা আমার জীবনে ছোট্ট থেকেই আছে I সে যাই হোক এবার তুমি বল যে তুমি এখানে কী করছো?


----- আমি ছবি তুলতে অনেক ভালোবাসি আর ওটাই আমার স্বপ্ন I তাই আজও নতুন ছবির সন্ধানে এখানে এসেছি I


---- তাহলে কেমিস্ট্রি নিয়ে কেনো পড়ছ?


----- মা বাবার খুশির জন্য I


---- তাহলে এই কারণে কেমিস্ট্রি কে এত ভয় পেতে? তা একটুও কি ভয় কেটেছে?


----- তারমানে সেদিন আপনি এটা বুঝতে পেরেই ওই কথা গুলো বলেছিলেন? বিশ্বাস করুন আমার ভয় অনেক কমে গেছে I


---- আজ্ঞে হ্যাঁ ম্যাডাম I যাক শুনে ভালো লাগলো যে কারুর ভয় কাটাতে পেরেছি I


এই বলে দুজনেই হেসে উঠলো I আর আবির হাসতে হাসতে দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে হারিয়ে গেলো এক নাম না জানা অনুভূতির ভিড়ে I


ঘোর কাটতে তারপর আবির বলে উঠলো


------- সো লেটস বি ফ্রেন্ডস?

------ স্যার সেটা কি করে সম্ভব? আপনি তো আমার টিচার?

----- এই যে ম্যাডাম এই তোমার বুদ্ধি? তুমি জানোনা যে টিচার মানে ফিলোজাফার, গাইড?


দৃষ্টি কিছু না বলে হালকা হাসলো I


----- তাহলে ফ্রেন্ডস ?


কথাটা বলে আবির হাতটা বাড়িয়ে দিলো I আর দৃষ্টি ও হুম বলে আবির এর হাতে হাত টা রাখলো I


----- এই যে ম্যাডাম ফ্রেন্ড হলাম মানে এটা ভেব না যে কেমিস্ট্রি তে এক্সট্রা হেল্প পাবে I


---- কখনো চাইবই না। হুহ।


এই বলে দুজন হেসে উঠলো I


" সময় বহিয়া যায়

ঝড়ের গতির ন্যায় "


সময় তার নিজের গতির সাহায্যে পার করে এসেছে অনেকটা পথ I


এখন আবির আর দৃষ্টি খুব ভালো বন্ধু I শুধু বন্ধু বলা ভুল, আবির এর দৃষ্টির প্রতি কেয়ার, নজর সব কিছুই দৃষ্টির মনে অনেক অনুভূতির সঞ্চার ঘটিয়েছে I দৃষ্টিও এখন এই অনুভূতি গুলোকে প্রশ্রয় দেয় I ওও বুঝতে পারছে যে এই অনুভূতি গুলো হয়তো ভালোবাসারই চিহ্ন I কিন্তু ও আবিরের অনুভূতি সম্পর্কে অজ্ঞ্যাত।


দেখতে দেখতে দৃষ্টির তৃতীয় বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা এসে হাজির I না এখন আর দৃষ্টি কেমিস্ট্রি কে ভয় পায় না বরং খুব ভালোবাসে আর সেটার কৃতিত্বও আবিরের I



একদিন নিজের কিছু দরকারে আবিরের বাড়ি আসে I কিন্তু ওর ঘরে ঢোকার আগেই কিছু শুনে দাঁড়িয়ে যায় I


ঘরের ভেতর ...

----- ভাই আমি সত্যি বলছি, আমি না দৃষ্টি কে খুব ভালোবেসে ফেলেছি I জানিস যেদিন ওকে প্রথম ওই বেঞ্চে গুটিশুটি মেরে বসে থাকতে দেখেছিলাম, সেদিন থেকেই আমার মনে ওর জন্য অনুভূতিরা জন্ম নেয় ই


ওর সামনে থাকতে আমার ভালো লাগতো, ওর চোখ দুটো খুব কাছে টানত আমায় ই

তারপর যখন ওর সাথে বন্ধুত্ব করি তখন আমি ওকে আরো ভালো করে বুঝতে পারি ই

বুঝতে পারি যে ও গঙ্গার ন্যায় পবিত্র সদ্য পরিস্ফুটিত একটা ফুল ই

যার অন্তর টা একটা নিষ্পাপ শিশুর মতো I ওর কথা বলা, ওর ঝগড়া করা, ওর হাসি, কান্না সব আমার অভ্যাস হয়ে গেছে I

খুব ভালোবেসে ফেলেছি রে I


অপর পাশের ব্যাক্তি টি বললো

---- তাহলে বলে দে ওকে


---- না রে এখনও সেই সময় আসেনি I কারণ ওকে এখন নিজের ভবিষ্যত টা গুছিয়ে নিতে হবে I চোখ মেলে দেখা স্বপ্নগুলো সত্যি করতে হবে I


দৃষ্টি কথা গুলো শুনে ঘরের ভিতরে আর প্রবেশ করতে পারেনি I ওর দু চোখ দিয়ে অশ্রুধারা বয়ে চলেছে কারণ ও ভাবেনি যে আবির ওকে এতটা ভালোবাসে I আর সত্যি নিজের ভালোবাসার মানুষটার কাছ থেকে এতটা ভালোবাসা পেলে কার না ভালো লাগে??


সেদিন দৃষ্টি আবির এর সাথে দেখা না করেই বাড়ি চলে আসে, কারণ ও এই মুহূর্তে চায় না আবির এর কাছে ধরা দিতে I

বরং চায় আবির এর ইচ্ছা মত এবং নিজের জন্য নিজের ভবিষ্যত টা গড়তে I


দেখতে দেখতে তৃতীয় বর্ষের পরীক্ষাও শেষ হয়ে যায় আর দৃষ্টির বাড়িতে দৃষ্টির জন্য পাত্র দেখতে শুরু করে I কিন্তু দৃষ্টি যার জন্য অপেক্ষা করছে সে এখনো ওকে কিচ্ছু বলে উঠতে পারে নি I


দৃষ্টি ভেবেছিল যে যদি ও আবির কে নিজের বিয়ের কথা বলে তাহলে আবির ওকে নিজের মনের কথাটা জানিয়ে দেবে I তাই ও আবির কে ফোন করে এবং বলে,


--- আবির আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে I


আবির কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে ওঠে


----- বাহ অভিনন্দন, খুব ভালো খবর এটা I

আবিরের চোখ দুটো অশ্রুধারায় পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে I


----- আপনি কিছু বলবেন না আমায়?


------ হ্যাঁ বলব তো, তোমাকে একটা কথা বলার আছে আমার তোমাকে I


----- বলুন না প্লিজ আমি শুনব বলেই তো বসে আছি I


----- আমি বিদেশ চলে যাচ্ছি দুই মাসের জন্য, একটা অফার পেয়েছি I


দৃষ্টির চার পাশ স্তব্ধ হয়ে যায় I

ও তো অন্য কিছু শুনতে চেয়েছিলো I কিন্তু এটা কি বললো আবির I

দৃষ্টি কিছু না বলেই ফোন টা কেটে দেয় I

আবির এটা দেখে বারবার ফোন করতে থাকে, কিন্তু দৃষ্টি প্রত্যেক বার কেটে দেওয়ায় আবির ভাবে দৃষ্টি হয়তো ওকে এড়িয়ে যাচ্ছে বা ব্যাস্ত আছে I


আজ আবিরের নিজেকে প্রচুর অসহায় লাগছে I


ওর চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা করছে যে যেও না দৃষ্টি আমায় ছেড়ে I

আমি মরে যাবো তোমায় ছাড়া I

কিন্তু পারছে না তাই বারান্দা টাই আজ সাক্ষী হচ্ছে আবির এর এই বুক ফাটা কান্নার I


ওদিকে দৃষ্টি চেয়েও কিছু বলতে পারছে না আবির কে I অভিমান টা আজ বড়ো হয়ে দাঁড়িয়েছে I

তাই ও সিদ্ধান্ত নেয় যে ও এই বিয়ে টা করবে I দৃষ্টির বিয়ে ঠিক হয় ঠিক তিন মাস পর I


অভিমান টাই বড়ো হয়ে হারায় দুজনের কাছে।


এরপর আবির বিদেশ চলে যায় কিন্তু দৃষ্টি কে ভুলতে পারে না আর ও চায়ও না ভুলতে I

ওর মতে একতরফা ভালোবাসা গুলোই এরকম I ভালোবাসা টা একটা সম্পূর্ণ অন্য অনুভূতি ।

কেউ কাউকে ভালোবাসতেই পারে, কিন্তু তার মানে এটা নয় যে তাকেও ভালোবাসতে হবে I

কাউকে যদি নিঃসার্থ ভাবে ভালোবাসা হয় , কোনো চাওয়া পাওয়ার আশা ছাড়াই I

তাহলে ওই একটা মানুষকে ভালোবেসেই সারা জীবন কাটিয়ে দেওয়া যায় I


তাই ও চায় দৃষ্টি কে নিজের অন্তরে রেখে বাকি জীবন চলতে I

প্রত্যেক টা মুহূর্ত ও দৃষ্টি কে মিস করে I কিন্তু কোনো উপায় নেই I


দু দিকে দুটো মানুষ একই কারণে কষ্ট পাচ্ছে , কিন্তু স্বীকার কেউ করবে না I


আজ আবির ফিরে আসছে বিদেশ থেকে I তাই দৃষ্টি গেছে ওকে এয়ারপোর্ট থেকে আনতে I আজ ওরা এয়ারপোর্ট থেকে সোজা কলেজ যাবে I আজ কলেজে অনুষ্ঠান আছে, আর তাতে দৃষ্টি গান করবে I


আবির এয়ারপোর্ট এ নামলে দৃষ্টি দেখলো যে ওর সাথে আর একজন মেয়ে এসেছে ই

আবির কে জিজ্ঞেস করলে আবির বলে ওটা ওর গার্লফ্রেন্ড I

কথাটা শুনে দৃষ্টির সমস্ত পৃথিবী টাই থমকে যায় I তাহলে সেদিন যেটা ও শুনে ছিল সেটা কি?

সেটা কি ওদের সম্পর্কের মতোই একটা মিথ্যা?


এদিকে কথাটা বলার পর আবির নিজের মনে বলে ওঠে,

----- বিশ্বাস কর দৃষ্টি তুমি ছাড়া আমি কাউকে ভাবতেও পারি না I আমি আমার বোনকে সাথে নিয়ে এসেছি যাতে অন্তত তোমার সামনে দাঁড়াতে পারি I কারণ একা এলে আমি তোমার সামনে দাঁড়াতেও পারবো না I আমার অনুভূতি রা ধরা দিতে চাইবে I

কিন্তু আমি চাই না যে আমার অনুভুতিরা তোমার সুখের পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়াক I


ওদিকে দৃষ্টির মন আজ চাইছে সব স্বীকার করে নিতে I কিন্তু ওই বলে না,


"মেয়েদের বুক ফাটে

কিন্তু মুখ ফোটে না I "


সেইরকম রকম অবস্থা দৃষ্টির I এরপর ও স্টেজে ওঠে গান গাইতে I চারিদিক অন্ধকার হয়ে হালকা সুর ভেসে এলো এবং দৃষ্টি সুর মিলিয়ে গেয়ে উঠলো...


কেন রোদের মতো হাসলে না ?

আমায় ভালোবাসলে না ?

আমার কাছে দিন ফুরালো, আসলে না ।

এই মন কেমনের জন্মদিন,

চুপ করে থাকা কঠিন,

তোমার কাছে খরস্রোতাও গতিহীন।


নতুন সকাল গুলো কপাল ছুঁলো তোমারি,

দূরে গেলেও এটাই সত্যি তুমি আমারি,

শুধু আমারই । ।

রোদের মতো হাসলে না ?

আমায় ভালোবাসলে না ?

আমার কাছে দিন ফুরালো আসলে না ।


জলে ভেজা চোখ বোজা ঘুম খোঁজা ভোর,

নিশানা তির স্মৃতির ভীড় এলোমেলো ঘরদোর ।

জলে ভেজা চোখ বোজা ঘুম খোঁজা ভোর,

নিশানা তির স্মৃতির ভীড় এলোমেলো ঘরদোর ।


মেঘ আসে এলোকেশে ছুঁয়ে দিলে সব চুপ ।

সেই মেঘ বালিকার গল্প হোক

শহর জুড়ে বৃষ্টি হোক

রোদ্দুর হোক আজ শুধুই তার ডাকনাম ।

পাতা ভরা শব্দ টুকরোরা

কালবৈশাখীর মতো মুখ চোরাসব ভিজে যাক শুধু বেঁচে থাক অভিমান

নতুন সকাল গুলো কপাল ছুঁলো তোমারি

বেঁধে রাখতে পারলে তুমিও হতে আমারি

শুধু আমারি । ।


গান আজ কথা হয়ে বেরোচ্ছে দৃষ্টির কন্ঠ থেকে I আবির যদি ঠিক করে লক্ষ্য করতো তাহলে বুঝতে পারতো গানটা ওর জন্য আর সাথে দেখতে পেতো দৃষ্টির চোখ থেকে নিঃশব্দে ঝড়ে পড়া অশ্রুধারা গুলো I


সেদিন গানের পর থেকে আর ওদের দেখা হয়নি ই

আর আজ দৃষ্টির বিয়ে I

সাজতে বসার আগেই দৃষ্টির কাছে একটা ফোন আসে অজানা নাম্বার থেকে I


কেঁদে কেঁদে ওর গলাটা পুরো বসে গেছে। নাকটা টেনে ও ফোন টা ধরে।


---- হ্যালো, কে বলছেন?

ওপাশে থাকা ব্যাক্তি---- দৃষ্টি দি আমি আবির এর বোন I তুমি আমার কথাটা প্লিজ শোনো নাহলে সব শেষ হয়ে যাবে।


মেয়েটি বলতে শুরু করে কিভাবে আবির কষ্ট পেয়ে দৃষ্টির থেকে দূরে সরে যেতে বিদেশে চলে গেছিল I আর কেনো বিদেশে থেকে ফিরে এসে নিজের বোনকে গার্লফ্রেন্ড এর পরিচয় দিয়েছিলো I


----- দৃষ্টি দি তুমি বাঁচাও আমার দাদাকে কাল থেকে কিছু মুখে দেয়নি জানো I শুধু দরজা বন্ধ করে কেঁদে যাচ্ছে I


----- এই মেঘ তোমার দাদা টা কি পাগল ? একবার আমায় বললো না?

জিজ্ঞাসা করলো না সত্যি টা কি? মহান হচ্ছে না? হওয়াচ্ছি মহান I


একদিকে ও কাঁদছে আর এক দিকে ঠোঁটের কোণের মিষ্টি হাসি টা আবার ফুটে উঠেছে সব ফিরে পাবার আশায়।


দৃষ্টির বাড়ির লোকেরা ওকে কখনো বারণ করেন নি কিছুতে I

ওনারা একটা জিনিসই চান মেয়ের মুখে হাসি I তাই দৃষ্টি যখন আবিরের কথা বাড়িতে বলে কেউ আপত্তি করেননি I


বর্তমান ,


একটি ছেলে হাতে গিটার হাতে সুর তুলেছে খোলা আকাশের নীচে তার দুই চোখ দিয়ে বয়ে চলেছে অশ্রুধারা।

গানের মাধ্যমে ব্যক্ত করতে চাইছে তার সমস্ত ভালোবাসা ,দুঃখ,কষ্ট ,অভিমান ।

হঠাৎ কারুর ডাকে পিছন ঘুরে তাকায়, আর সামনে থাকা মানুষটিকে অর্থাৎ মেয়েটিকে সেই সময় দেখে অবাক হয়ে যায়।


মেয়েটি সিক্ত নয়নজোরা নিয়ে কাঁপা কাঁপা স্বরে বলে ওঠে

------- গানের মাধ্যমে এত কিছু বলতে পারছেন, অথছ একবার সামনে এসে ওই সামান্য কথাটা স্বীকার করা গেলো না? এইভাবে দূরে চলে এলেন I


আবির ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে দৃষ্টির দিকে কি অপূর্ব লাগছে দৃষ্টি কে কনের সাজে I

চোখ সরানো যাচ্ছে না I কিন্তু বাস্তব টা মনে পড়তেই দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে ওকে জিজ্ঞেস করে,


---- তুমি এখানে কী করছো?

---- কেনো না এলে খুশি হতেন? যদি অন্য কারুর হয়ে যেতাম তাহলে খুশি হতেন?

---- মানে?

----- মানে বিয়ে ভেঙ্গে এসেছি আমি I আমি পারবোনা আপনাকে ছেড়ে থাকতে I বড্ড ভালোবাসি যে আপনাকে I


আবির নির্বাক হয়ে শুনছে I ও তো সব আশা ছেড়ে দিয়েছিলো ভাবেনি এই সুযোগ আবার কখনো ওর সামনে আসবে I আর যখন সুযোগ এসেছে ও তা হাত ছাড়া করতে চায় না ই


তাই বলে ওঠে,


---- আমিও তোমাকে খুব ভালোবাসি দৃষ্টি I


------ এই একটা কথা বলতে আপনি এতো সময় লাগিয়ে দিলেন? আপনি সেই আবির হতেই পারেন না যে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে আমার সব কষ্ট বুঝে যেতো I


----- আমি খুব ভুল করেছি দৃষ্টি, বড্ডো ভুল বুঝে ফেলেছি তোমায়।

একবার ক্ষমা করে দাও I

আর কখনো কোনো ভুল হবে না দেখো I


--- ঠিক আছে ক্ষমা করে দিতে পারি কিন্তু তার বদলে শাস্তি পেতে হবে I


------ কী শাস্তি আমি সব শাস্তি মাথা পেতে নেবো I


------ আমায় বিয়ে করতে হবে I আর সেটা আজকেই I কী রাজী তো? এটাই কিন্তু লাস্ট চান্স I


----- কেনো রাজী হব না I আমি রাজী I আর দেখো এবার আমি আর কোনো ভুল করব না ই আর কোনো ভুল বোঝাবুঝি নয়। আর কোনো মান অভিমান নয় এবার শুধু আমরা নিজেদের ভালোবাসা দিয়ে রঙিন করে তুলব আমাদের জীবনের ভালোবাসার ক্যানভাস 💖 I


আবির দৃষ্টিকে বাহুবন্ধন আবদ্ধ করলে, দৃষ্টিও আবিরকে জড়িয়ে ধরে। দুজনের চোখেই আজ খুশির অশ্রু।

কিছুক্ষন এভাবে থাকার পর আবির দৃষ্টির কপালে সস্নেহে একটা ভালোবাসার পরশ এঁকে দেয় এবং তার সাথেই ওদের ভালোবাসার ক্যানভাসে প্রথম ভালোবাসার রঙের ছোঁয়া লাগে I


***************** সমাপ্ত ***********************